দুশ্চিন্তা, বিপদ ও দুঃখের দু‘আ
সাবীল লাইব্রেরিতে দুশ্চিন্তা, বিপদ ও দুঃখের শিরোনামে যে দু‘আগুলো আছে। উদ্ধৃত প্রতিটি দু‘আর সাথে আছে তার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ, আর লাইব্রেরির দেওয়া সূত্র ও মান।
এআই-এর লেখা · আলেমদের পর্যালোচনা বাকি আছে
এই প্রবন্ধের কথাগুলো সাবীল লাইব্রেরি ও তার উৎসগুলো থেকে এআই লিখেছে, এবং এআই-ই সেগুলোর সাথে মিলিয়ে তা যাচাই করেছে। কোনো আলেম এখনও এটি পর্যালোচনা করেননি। আরবি পাঠ, সেগুলোর অর্থ ও সেগুলোর সূত্র লাইব্রেরি ও কুরআনের নিজস্ব, সেখানে যেমন আছে হুবহু তেমনই দেখানো। নিজের অবস্থার ব্যাপারে ফতোয়ার জন্য একজন যোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
প্রকাশিত ৩ অক্টোবর, ২০২৬পড়তে ৫ মিনিট
মন যখন ভারী হয়ে থাকে, সেই সময়ের জন্য সাবীল লাইব্রেরিতে যে দু‘আগুলো আছে, এই পাতায় সেগুলো এক জায়গায় আনা হয়েছে: দুশ্চিন্তার, বিপদের ও দুঃখের দু‘আ। এখানে উদ্ধৃত প্রতিটি দু‘আ লাইব্রেরিতে যেভাবে আছে সেভাবেই দেখানো হয়েছে: তার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ, আর সাথে লাইব্রেরির দেওয়া সূত্র ও মান।
এই পাতা কোনো বিধান দেয় না; কোন দু‘আ কখন বা কতবার পড়তে হবে, সে কথাও নিজে থেকে ঠিক করে দেয় না। নিজের অবস্থা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
ইউনুসের ডাক
দু‘আ সংকলনে ‘দুশ্চিন্তা ও দুঃখ’ শিরোনামে তিনটি দু‘আ আছে। প্রথমটিকে লাইব্রেরির সূত্রের লাইনে বলা হয়েছে অন্ধকারের ভেতর থেকে ইউনুসের ডাক, আর সেখানে আয়াতটির নম্বরও দেওয়া আছে: কুরআন ২১:৮৭। একই লাইনে লাইব্রেরি তিরমিযীর সূত্রে, সহীহ মান দিয়ে, উল্লেখ করেছে যে কোনো মুসলিম এই দু‘আ দিয়ে যে বিষয়েই দু‘আ করুক, আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন।
দু‘আটি যে আয়াতের অংশ, সেই পুরো আয়াত:
আর স্মরণ করুন, যুন-নূনকে [১], যখন তিনি ক্রোধ ভরে [২] চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে, আমরা তাকে পাকড়াও করব না [৩]। তারপর তিনি অন্ধকারে [৪] এ আহবান করেছিলেন যে, ‘আপনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই; আপনি কতইনা পবিত্র ও মহান, নিশ্চয়ই আমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি’ [৫]।
[১] ইউনুস ইবন মাত্তা আলাইহিস সালামের কাহিনী পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুস, সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা আস-সাফফাত ও সূরা আল-কালামে বিবৃত হয়েছে। কোথাও তার আসল নাম উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও যুননুন এবং কোথাও ছাহেবুল হূত উল্লেখ করা হয়েছে। নূন ও হূত উভয় শব্দের অর্থ মাছ। কাজেই যুননুন ও সাহেবুল হূতের অর্থ মাছওয়ালা। ইউনুস আলাইহিস সালামকে কিছুদিন মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়েছিল এই আশ্চর্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে যুননুন বা ছাহেবুল হূত শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন তাফসীরে এসেছে যে, ইউনুস আলাইহিস সালামকে মুসেলের একটি জনপদ নায়নুয়ার অধিবাসীদের হেদায়াতের জন্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমান ও সৎকর্ম করার দাওয়াত দেন। তারা অবাধ্যতা প্ৰদৰ্শন করে। ইউনুস আলাইহিস সালাম তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আযাবের ভয় দেখিয়ে জনপদ ত্যাগ করেন। এতে তারা ভাবতে থাকে যে এখন আযাব এসেই যাবে। (কোনো কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায় যে আযাবের কিছু কিছু চিহ্নও ফুটে উঠেছিল) তাই অনতিবিলম্বে তারা শির্ক ও কুফর থেকে তওবা করে নেয় এবং জনপদের সব আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তারা চতুষ্পদ জন্তু ও বাচ্চাদেরকেও সাথে নিয়ে যায় এবং বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়। এরপর সবাই কান্নাকাটি শুরু করে এবং কাকুতি-মিনতি সহকারে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে। জন্তুদের বাচ্চারা মাদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়ার কারণে পৃথক শোরগোল করতে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের খাটি তাওবা ও কাকুতি-মিনতি কবুল করে নেন এবং তাদের উপর থেকে আযাব হটিয়ে দেন। এদিকে ইউনুস আলাইহিস সালাম ভাবছিলেন যে, আযাব আসার ফলে তার সম্প্রদায় বোধ হয় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলেন যে, আদৌ আযাব আসেনি এবং তার সম্প্রদায় সুস্থ ও নিরাপদে দিন গুজরান করছে, তখন তিনি চিন্তান্বিত হলেন যে, এখন আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করা হবে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, তার সম্প্রদায়ের মধ্যে কেউ মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে হত্যা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। এর ফলে ইউনুস আলাইহিস সালামের প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিল। তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে ফিরে আসার পরিবর্তে ভিনদেশে হিজরত করার ইচ্ছায় সফর শুরু করলেন। পথিমধ্যে একটি নদী পড়ল। তিনি একটি নৌকায় আরোহন করলেন। ঘটনাক্রমে নৌকা আটকে গিয়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল। মাঝিরা বলল যে, আরোহীদের মধ্যে একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। তাহলে অন্যরা ডুবে মরার কবল থেকে রক্ষা পাবে। এখন কাকে ফেলা হবে, এ নিয়ে আরোহীদের নামে লটারী করা হলে ঘটনাক্রমে এখানে ইউনুস আলাইহিস সালামের নাম বের হল। এই লটারীর কথা উল্লেখ প্রসঙ্গে কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে “লটারীর ব্যবস্থা করা হলে তার (ইউনুস আলাইহিস সালামের) নামই তাতে বের হয়।” [সূরা আস-সাফফাত ১৪১] তখন ইউনুস আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনাবশ্যক কাপড় খুলে নদীতে ঝাপিয়ে পড়লেন। এদিকে আল্লাহ তা'আলা সবুজ সাগরে এক মাছকে আদেশ দিলে সে সাগরের পানি চিরে দ্রুতগতিতে সেখানে পৌছে যায় (ইবন মাসউদের উক্তি) এবং ইউনুস আলাইহিস সালামকে উদরে পুরে নেয়। আল্লাহ তা'আলা মাছকে নির্দেশ দেন যে, ইউনুস আলাইহিস সালামের অস্থি-মাংসের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে তার খাদ্য নয়, বরং তার উদর কয়েকদিনের জন্যে তার কয়েদখানা। [ইবন কাসীর] কুরআনের বক্তব্য ও অন্যান্য বর্ণনা থেকে এতটুকু জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার পরিষ্কার নির্দেশ ছাড়াই ইউনুস আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। তার এই কার্যক্রম আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। ফলে তিনি অসন্তোষের কারণ হন এবং তাকে সমুদ্রে মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়।
[২] অর্থাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। বাহ্যতঃ এখানে সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ৰোধ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পালনকর্তার খাতিরে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। কাফের ও পাপাচারীদের প্রতি আল্লাহর খাতিরে রাগাম্বিত হওয়া সাক্ষাত ঈমানের আলামত। [ফাতহুল কাদীর] অন্য অর্থ হচ্ছে, তিনি জাতির উপর রাগ করে চলে গেলেন। [ফাতহুল কাদীর]
[৩] অভিধানের দিক দিয়ে نقدر শব্দের তিন রকম অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রথম, কাবু করা। অর্থাৎ তিনি ধারণা করলেন যে, আমি তাকে কাবু করতে পারব না। বলাবাহুল্য, এরূপ ধারণা কোনো নবী তো দূরের কথা সাধারণ মুসলিমও করতে পারে না। কারণ, এরূপ মনে করা প্রকাশ্য কুফর। [ফাতহুল কাদীর] কাজেই আয়াতে এই অর্থ হওয়া মোটেই সম্ভবপর নয়। দ্বিতীয় অর্থ, সংকীর্ণ করা। যেমন, অন্য আয়াতে রয়েছে:
اللّٰهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَّشَآءُ وَيَقْدِرِْ
“আল্লাহ যার জন্যে জীবিকা প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্যে ইচ্ছা সংকীর্ণ করে দেন।” [সূরা আর-রা'দ ২৬], অনুরূপ আয়াত আরও [দেখুন, সূরা আল-ইসরা ৩০, সূরা আল-কাসাস ৮২, সূরা আল-আনকাবৃত ৬২, সূরা আর-রূম ৩৭, সূরা সাবা ৩৬, সূরা আয-যুমার ৫২, সূরা আশ-শূরা ১২] যেখানে সর্বসম্মতভাবে অর্থ হচ্ছে সংকীর্ণ করা। তখন আয়াতের অর্থ হবে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়কে ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার ব্যাপারে আমার প্রতি কোনোরূপ সংকীর্ণ আচরণ করা হবে না। [ফাতহুল কাদীর] তৃতীয় অর্থ, বিচারে রায় দেয়া। তখন আয়াতের অর্থ হবে এই যে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, এ ব্যাপারে আমার কোনো ত্রুটি ধরা হবে না। তাই আমাকে পাকড়াও করা হবে না। [ইবন কাসীর] মোটকথা, প্রথম অর্থের সম্ভাবনাই নেই, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অর্থ সম্ভবপর।
[৪] অর্থাৎ মাছের পেটের মধ্য থেকে সেখানে তো অন্ধকার ছিলই, তার উপর ছিল সাগরের অন্ধকার ও রাতের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] অথবা মাছের পেটের অন্ধকার, সে মাছের পেট থেকে অপর মাছের পেটের অন্ধকার তার উপর রয়েছে সমুদ্রের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] ইবন মাসউদ ও ইবন আব্বাস বলেন, তাকে নিয়ে মাছটি সমুদ্রের গভীরে চলে গেলে সেখানে ইউনুস আলাইহিস সালাম পাথরের তাসবীহ শুনতে পেয়ে তাসবীহ পড়ার কথা স্মরণ করলেন এবং তিনি সেই দোআটি করলেন। [ইবন কাসীর]
[৫] ইউনুস আলাইহিস সালামের দোআ প্রত্যেকের জন্যে, প্রতি যুগের ও প্রতি মকসুদের জন্যে মকবুল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মাছের পেটে পাঠকৃত ইউনুস আলাইহিস সালামের এই দোআটি যদি কোনো মুসলিম কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে পাঠ করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তা কবুল করেন।” [তিরমিযী ৩৫০৫]
দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয়
একই কার্ডের পরের অংশে থাকা দ্বিতীয় দু‘আয় আটটি বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে; তালিকার শুরুতেই আছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ, আর শেষে ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন। লাইব্রেরি এর সূত্র দিয়েছে বুখারী, মান সহীহ।
সব বিষয় শুধরে দেওয়ার দু‘আ
একই শিরোনামের দ্বিতীয় কার্ডে একটিই দু‘আ। লাইব্রেরি এর সূত্র দিয়েছে নাসাঈর ‘আমালুল ইয়াওমি ওয়াল-লাইলাহ’ গ্রন্থ, আর মান লিখেছে হাসান। দু‘আটির নিচে ‘একটি কথা’ নামে লাইব্রেরির নিজের একটি টীকা আছে। তাতে বলা হয়েছে, দুঃখ যখন কথা কেড়ে নেয়, তখন এই দু‘আগুলোই কথা হয়ে যায়; আর মুখস্থ না থাকলে পড়ে নেওয়া যায়, কারণ পড়াও দু‘আ।
যেকোনো বিপদে
পকেট সঙ্গীর ‘বিপদ ও দুশ্চিন্তা’ কার্ডের প্রথম দু‘আটির ওপরে লাইব্রেরির লেবেলটি ইংরেজিতে লেখা; তার অর্থ ‘যেকোনো বিপদে’। সূত্রের লাইনে একে বলা হয়েছে বিপদের দু‘আ; সূত্র বুখারী ও মুসলিম, মান সহীহ।
ওই কার্ডের পরের অংশে ওপরের দুটি দু‘আ, অর্থাৎ আশ্রয় চাওয়ার দু‘আ ও ইউনুসের দু‘আ, আবার দেওয়া আছে। ইউনুসের দু‘আর আরবি একই। আশ্রয় চাওয়ার দু‘আয় কৃপণতা ও কাপুরুষতার শব্দ দুটি পকেট সঙ্গীতে আছে দু‘আ সংকলনের উল্টো ক্রমে, আর অর্থ দেওয়া হয়েছে সংক্ষিপ্ত তালিকা হিসেবে। লাইব্রেরি দুই জায়গাতেই সূত্র দিয়েছে বুখারী; কোনটি পড়তে হবে, এই পাতা তা ঠিক করে দেয় না। সেগুলো এখানে আর আলাদা করে দেখানো হলো না।
শোক যখন কারও মৃত্যুতে
পকেট সঙ্গীতে ‘শোক ও মৃত্যু’ শিরোনামে দুটি কার্ড আছে। প্রথমটিতে আছে কারও মৃত্যুর খবর শুনে যা বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ; দ্বিতীয়টিতে আছে শোকার্তকে সান্ত্বনা দেওয়ার কথা এবং কবরের কাছে সালাম।
এই দুই কার্ডের কয়েকটি পাঠ নিয়ে লাইব্রেরির নিজস্ব যাচাইয়ে কিছু প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয়নি: পাঠের শব্দ নিয়ে, অর্থ নিয়ে, আর একটির ক্ষেত্রে যে গ্রন্থের নাম দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে। তাই কার্ড দুটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো না। লাইব্রেরিতে যেভাবে আছে সেভাবে পড়তে চাইলে পকেট সঙ্গীর ‘শোক ও মৃত্যু’ কার্ডের প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশ দেখুন।
এরপর কোথায় যাবেন
- প্রয়োজন অনুযায়ী দু‘আ পাতায় দু‘আ সংকলনের বাকি দু‘আগুলো আছে, প্রয়োজন ধরে সাজানো।
- দু‘আ সংকলন ও পকেট সঙ্গী কার্ড হিসেবে প্রিন্ট করে সঙ্গে রাখা যায়।
- লাইব্রেরির জানাযা শিরোনামে আছে শেষ শ্বাস থেকে কবর ভরাট পর্যন্ত ধারাবাহিক করণীয়।